ফজল কাদির: দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে চিরায়ত পেশা শিক্ষকতার পাশাপাশি মধু চাষ করে মধুর জীবন গড়ছেন সাহানুর ইসলাম। জলঢাকা বগুলাগাড়ী হুসাইনিয়া (রাঃ) কওমিয়া মহিলা হাফিজিয়া মাদ্রাসার শিক্ষকতায় স্বল্প বেতনে চাকুরীতে ৪ সদস্যের পরিবারে টানাপোড়েন কাটাতে সাহানুর ঝুঁকেন মধু চাষে। মধু চাষে এখন মধুর জীবন গড়ছেন।
সরিষা ক্ষেত, মিষ্টিকুমড়া, লিচুবাগান সহ বিভিন্ন ফলবাগান ও ফসল মাঠে মৌবাক্স নিয়ে ছুটছেন সাহানুর। প্রায় ৩ বছর ধরে তিনি তার এলাকা ও জেলার বাইরে ঠাকুরগাঁও জেলা, লালমনিরহাট জেলা সহ বিভিন্নস্থানে মধু সংগ্রহ করেন। মধু সংগ্রহ করে স্থানীয়ভাবে কিংবা অনলাইন অর্ডারে তা বিক্রি করে আয় করছেন সাহানুর। মাঝে তার ভাটা পড়ে তার মধু সংগ্রহে। একটি সরিষা ক্ষেতে চাষী কিটনাশক স্প্রে করলে প্রায় অর্ধেক মাছি মারা যায়। এখন ঘুরে দাড়িয়েছেন। তিনি এখন ১০টি এপিস মেলিফেরা প্রজাতির ও ৫টি এপিস সেরেনা প্রজাতির মৌমাছি চাষ করছেন। এর মধ্যে এপিস সেরেনা জাতের মৌমাছির মধু বাজারে ভীষণ কদর আছে; দামও বেশী। প্রায় দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা কেজি। এপিস মেলিফেরা প্রজাতি মৌমাছির মধু বাজারমুল্য ৮০০ টাকা থেকে ১২০০ টাকা।
তিনি কিশোরগঞ্জ উপজেলার পুটিমারী ইউনিয়নের স্মশানের বাজার সংলগ্ন প্রফেসর অনিল রায়ের লিচুবাগানে সংগ্রহ করা ১০টি মৌবাক্সের মৌচাক ফ্রেম থেকে হারভেস্টিং মেশিনে পরিচ্ছন্ন ৭ কেজি মধু সংগ্রহ করেন। যার বাজার মুল্য প্রায় ৭ হাজার টাকা। এটি লিচু ফুল ও মিষ্টিকুমড়া ফুলের সমন্বিত মধু। এর আগে একই ইউনিয়নের উত্তরপাড়ার প্রায় ২০০ বিঘার মিষ্টিকুমড়া ক্ষেতের ফুল থেকে মধু সংগ্রহ হয় এই বাক্সগুলোতে। মিষ্টিকুমড়া বড় হওয়ায় ফুল কম থাকায় ১০টি এপিস মেলিফেরা প্রজাতির বাক্স স্থানান্তর করেন মধুচাষী সাহানুর।
তিনি বলেন, লিচুবাগানে আশানুরূপ মধু সংগ্রহ হবে। ৪ দিন পরেই মধু সংগ্রহ করা যায়। সাহানুর বলেন, মধুচাষে আমি শুধু লাভবান হচ্ছি না। লিচুবাগানের মালিকও লাভবান হবেন। মৌমাছিরা যখন মধু সংগ্রহের জন্য এক ফুল থেকে অন্য ফুলে উড়ে বেড়ায়, তখন তাদের লোমশ শরীরে পরাগরেণু লেগে যায়। এই রেণুগুলো যখন অন্য একটি ফুলের গর্ভমুন্ডে
স্থানান্তরিত করে তখন পরাগয়ন হয়। এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় মৌমাছিরা ফলন বৃদ্ধিতে ও গুনগত মান বাড়াতে ব্যাপক ভুমিকা রাখে। এছাড়াও তিন কিলোমিটার ব্যসার্ধ এলাকায় সকল ফলবাগান ও সবজি চাষীরা অধিক ফলন পাবেন। কারণ মৌমাছিরা তিন কিলোমিটার ব্যসার্ধব্যাপী ঘুরে মধু সংগ্রহ করে। মৌমাছির কারণে সফল পরাগায়নে অধিক ফলন পাচ্ছে চাষীরা। এ ব্যাপারে উত্তরপাড়ার মিষ্টিকুমড়া চাষী সহিদুল ইসলাম জানান, গত বছর ৪০ শতক জমিতে প্রায় ৮০ হাজার টাকা মুনাফা করেছি। এবারে জমিতে মৌচাষের কারণে লক্ষাধিক টাকা মুনাফার আশা করছি।
মধু চাষী সাহানুর বলেন, মধু চাষে খরচ তেমন নেই বললে চলে। ভরা মৌসুমে খরচ পরে না। মৌসুমের আগে ও পরে প্রায় সাড়ে ৪ মাস মাছি বেঁচে রাখতে খাদ্য হিসাবে চিনি দিতে হয়। একটি বাক্সে সপ্তাহে দুই দিন খাদ্য দিতে হয়। এই কাজটি বর্ষাকালে করতে হয়। এতে বাক্স প্রতি প্রায় ১২০০ টাকা খরচ পরে। মৌমাছিরা এসময় প্রাকৃতিক খাবার না পাওয়ায় মধু সংগ্রহ হয়ে উঠেনা। তবে বংশবিস্তার করে। এসময়ে মৌমাছি সংরক্ষণে সতর্ক থাকতে হয়। মাছির বাক্সগুলো বাড়ীর পাশে বাগানে কিংবা বাড়ী থেকে অদুরে রাজারহাট ময়দানে রাখতে হয়। অনেক সময় পাখী উৎপাত করলে তা তাড়াতে হয়। ভীমরুলও অনেক সময় আক্রমণ করে বসে। তখন ভীমরুলের চাক খুঁজে তা ধ্বস করতে হয়।
এককালীন খরচের বিষয়ে তিনি বলেন, মৌসুমের বাইরে ৮ ফ্রেম বিশিষ্ট একটি বাক্স ৬ হাজার টাকা খরচ পরে। এই খরচের বাইরে তেমন খরচ নেই। মাছি বাড়লে আমার মৌবাক্স বাড়বে; সেই সাথে আমার মধু সংগ্রহ বাড়বে। আমি যখন হাটহাজারী দারুল উলুম মাদ্রাসায় পড়াশুনা করতাম, তখন হুজুর বলেছিলেন, মাদ্রাসায় খেদমতের পাশাপাশি ব্যবসা কর। কারো কাছে হাত পাতবে না। তাই হুজুরের পরামর্শ জীবনের পাথেয় হিসাবে বেছে নিয়ে একসময় বালু ব্যবসা; এমনকি ভাঙারীর ব্যবসাও করেছি। পরে স্থানীয় মৌয়ালদের সাথে মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে মৌবাক্সের মাধমে মধুচাষে যুক্ত হই। এখন ভাল রোজগার করছি। আমার ৯ বছরের বড় সন্তান জলঢাকা মডেল মাদ্রাসায় লেখাপড়া করে। সে ভাল ফলাফল করছে। ৬ বছরের ছোট মেয়েটি আমার মাদ্রাসায় পরে। আল্লাহর মর্জ্জি সবাই দুধেভাতে আছি।
নীলফামারী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবু মো. মঞ্জুর রহমান জানান, জেলায় মোট ২৭ জন মৌচাষী আছেন। মৌচাষের কারণে জেলায় বিভিন্ন সবজি ও ফলবাগানে ফলন বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে সরিষা ক্ষেতে প্রচুর মধু সংগ্রহ হয়। যেসব জেলায় প্রচুর মধু চাষ হয়, সেসব স্থানে সরকার প্রণোদনা দিয়েছেন। জেলায় মৌচাষ বাড়লে সরকার বাহাদুর আমাদের দিকে সুনজর দিবেন বলে আশা করি। এলাকায় যত বেশী মৌচাষ হবে, তত বেশী মধু হবে। অর্গানিক মধু রাপ্তানী করে দেশের অর্থনীতি হবে আরো চাঙ্গা।
প্রকাশক ও সম্পাদক: মো: আবুল কালাম আজাদ
অফিস: হোল্ডিং নং- ৪২, মাহাতাব লেন, নিয়ামতপুর বৃত্তিপাড়া, সৈয়দপুর-৫৩১০, নীলফামারী।