সৈয়দপুর ০৬:২৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ জুন ২০২৪, ৮ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

দেশে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুদ বেড়েছে ৪১ হাজার ৪১৪ কোটি ঘনফুট

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০২:৪১:৩৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩১ ডিসেম্বর ২০২২ ১৪ বার পড়া হয়েছে

ফাইল ছবি

চোখ২৪.নেট অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ডেস্ক রিপোর্টঃ দেশে চলতি বছরে ছয়টি কূপ পুনঃখনন, অনুসন্ধান ও উন্নয়নের মাধ্যমে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুদ বেড়েছে ৪১ হাজার ৪১৪ কোটি ঘনফুট। চুক্তিভিত্তিক আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) মূল্য প্রতি এমএমবিটিইউ ১৪ ডলার। এই দর ধরে হিসাব করলে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের দাম দাঁড়ায় ৫৫ হাজার ৪১ কোটি টাকা। আর স্পট মার্কেট (খোলাবাজার) থেকে আমদানি করা প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দর ২৪.৭৫ ডলার ধরে হিসাব করা হলে দাম দাঁড়ায় ৯৭ হাজার ৩৭৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকা।

বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) ২০২১ সালের হিসাব অনুযায়ী, দেশে উত্তোলনযোগ্য প্রাকৃতিক গ্যাস মজুদ আছে ১০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ)। দেশে গ্যাসের বার্ষিক চাহিদা প্রায় এক টিসিএফ। যেকোনো কূপ থেকে মজুদ করা গ্যাসের সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ উত্তোলন করা যায়। এই হিসাবে দেশে উত্তোলনযোগ্য গ্যাস ছিল প্রায় আট টিসিএফ। এই উত্তোলনযোগ্য মজুদের সঙ্গে যুক্ত হলো ৪১ হাজার ৪১৪ কোটি ঘনফুট গ্যাস।

পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের মধ্যে দেশের ৪৬টি গ্যাসকূপ পুনঃখনন, অনুসন্ধান ও উন্নয়নের মাধ্যমে দৈনিক ৬১ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা নেয় সরকার। এই পরিকল্পনার আওতায় চলতি বছর বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রডাকশন কম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স) ছয়টি কূপ পুনঃখনন ও অনুসন্ধান কার্যক্রমের মাধ্যমে ৪১ হাজার ৪১৪ কোটি ঘনফুট গ্যাসের মজুদ বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে দৈনিক গ্যাসের উত্তোলন বাড়িয়েছে পাঁচ কোটি ঘনফুট। বর্তমান স্পট মার্কেটে (খোলাবাজার) এলএনজির দর বিবেচনায় এই দৈনিক উত্তোলন করা গ্যাসের দাম ৮২ কোটি টাকার বেশি।

এ ছাড়া খননকাজ চলমান থাকা তিনটি কূপে সম্ভাব্য গ্যাসের মজুদ আছে আরো ৩০৯.৫ বিলিয়ন ঘনফুট। এই তিনটি কূপ থেকে সম্ভাব্য দৈনিক উৎপাদন ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস।

জানতে চাইলে বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘২০২২ সালে ছয়টি কূপ পুনঃখনন ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুদ বাড়ানো হয়েছে ৪১ হাজার ৪১৪ কোটি ঘনফুট। আমরা দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধি করে এলএনজি আমদানির চাহিদা কমিয়েছি। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো না গেলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি করতে হতো। ’

মোহাম্মদ আলী বলেন, বর্তমানে বাপেক্স স্থলভাগে কূপ খননে শতভাগ সক্ষম। গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে বাপেক্স নিজেদের কাজগুলোর পাশাপাশি বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল) ও সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের (এসজিএফএল) গ্যাস ফিল্ডের ওয়ার্কওভার কাজগুলোও করে যাচ্ছে।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে গ্যাসের চাহিদা তিন হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। চাহিদার বিপরীতে এখন পেট্রোবাংলা সরবরাহ করছে দুই হাজার ৬৫০ থেকে দুই হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। তার মধ্যে দেশের ২২টি গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক দুই হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপন্ন হচ্ছে। বাকি ৪৫০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করে পূরণ করা হচ্ছে। আগে পেট্রোবাংলা চাহিদার বিপরীতে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ করতে পারত তিন হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট পর্যন্ত। বিশ্ববাজারে স্পট মার্কেট এলএনজির দাম বাড়ায় সরকার জুলাই মাস থেকে এই এলএনজি আমদানি বন্ধ রেখেছে। এর ফলে গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। স্বল্পমেয়াদি এই পরিকল্পনার আওতায় দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধিতে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি অনেক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, দেশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ছে। ফলে বাড়ছে গ্যাসের চাহিদা। কিন্তু গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় নতুন গ্যাসক্ষেত্র বাড়েনি। গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ব্যবধান বেড়েছে। চাহিদা সামাল দিতে সরকারকে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। দেশীয় গ্যাস উৎপাদনে যে খরচ হয়, এলএনজি আমদানিতে তার চেয়ে সাত থেকে ১০ গুণ বেশি খরচ হয়। এতে জ্বালানি বিভাগের ওপর ভর্তুকি চাপ বেড়েই চলেছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুরনো কূপগুলো ওয়ার্কওভারের মাধ্যমে গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে, এটি নিঃসন্দেহে খুবই ভালো উদ্যোগ। এই উদ্যোগ আরো আট থেকে ১০ বছর আগে নেওয়া হলে জ্বালানির সংকটে পড়তে হতো না। একই সঙ্গে সরকারকে উচ্চমূল্যের এলএনজি আমদানি করার দিকে ঝুঁকতে হতো না। সরকারকে এলএনজি আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর দিকে আরো নজর দিতে বললেন তাঁরা।

জ্বালানি

বাপেক্স সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরে ওয়ার্কওভার, উন্নয়ন ও অনুসন্ধান কার্যক্রমের আওতায় বাপেক্স ৯টি কূপ ওয়ার্কওভার ও অনুসন্ধান করে। এরই মধ্যে ছয়টি কূপের কাজ সফলভাবে শেষ হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সালদা গ্যাসক্ষেত্রের সালদা-২ ওয়ার্কওভার করে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুদ পেয়েছে ৫.২৫ বিসিএফ। এই কূপ থেকে দৈনিক গ্রিডে দেওয়া হচ্ছে তিন মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। সিলেট-৮ কূপে ওয়ার্কওভার করে গ্যাসের মজুদ পেয়েছে ৩২ বিসিএফ। এই কূপ থেকে দৈনিক গ্রিডে দেওয়া হচ্ছে পাঁচ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। সিলেটের কৈলাসটিলা-৭ কূপে ওয়ার্কওভার করে গ্যাসের মজুদ পেয়েছে ৪০ বিসিএফ। দৈনিক ১২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস গ্রিডে দেওয়া হচ্ছে এই কূপ থেকে। বিয়ানীবাজার-১ কূপটি ওয়ার্কওভার করে গ্যাসের মজুদ পেয়েছে ৬১ বিসিএফ। এখান থেকে দৈনিক গ্রিডে দিচ্ছে আট মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। ভোলার শাহবাজপুর ইস্ট-১ অনুসন্ধান কূপে ৩৬.৮৯ বিসিএফ গ্যাসের মজুদ পেয়েছে। এই কূপ থেকে ভোলায় সরবরাহ করা হচ্ছে দৈনিক ২২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্রের টকগী-১ অনুসন্ধান কূপটি উৎপাদনক্ষম করা হয়েছে। খুব শিগগিরই কূপটি উৎপাদনে যাবে। এই কূপে মজুদের পরিমাণ ২৩৯ বিসিএফ এবং দৈনিক ২০ মিলিয়ন ঘনফুট হারে গ্যাস গ্রিডে দেওয়া যাবে।

বাপেক্স সূত্রে আরো জানা গেছে, বাকি তিনটি চলমান কূপের মধ্যে শ্রীকাইল নর্থ-১ অনুসন্ধান কূপে সম্ভাব্য গ্যাস মজুদের পরিমাণ ৪৫.৫ বিসিএফ। এই কূপ থেকে দৈনিক ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট হারে গ্যাস গ্রিডে দেওয়া যাবে। ভোলা নর্থ উন্নয়ন কূপটিতে ১৯১ বিসিএফ সম্ভাব্য মজুদ রয়েছে, কূপটি থেকে দৈনিক ২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস গ্রিডে দেওয়ার সম্ভাবনা আছে। শরীয়তপুর-১ অনুসন্ধান কূপে সম্ভাব্য ৭৩ বিসিএফ গ্যাস মজুদ রয়েছে, দৈনিক ১০ মিলিয়ন ঘনফুট হারে গ্রিডে দেওয়া যাবে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, কূপ ওয়ার্কওভার ও অনুসন্ধানের উদ্যোগটি ধরে রাখতে পারলে খুবই ভালো। এভাবে অব্যাহত থাকলে খুব দ্রুতই আরো ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন বাড়বে। তিনি আরো বলেন, এই উদ্যোগ পেট্রোবাংলার আরো আগেই নেওয়া উচিত ছিল। কূপ ওয়ার্কওভার ও উন্নয়নের পাশাপাশি নতুন নতুন কূপ অনুসন্ধান চালিয়ে গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর দিকেও জোর দিতে হবে।

জ্বালানি বিভাগের হিসাব মতে, ২০২১-২২ অর্থবছরে এলএনজি আমদানি বাবদ ব্যয় হয়েছে ৩৮ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা। মূলত সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি পণ্যটির দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়লেও এ অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে সংস্থাটির। স্পট এলএনজি আমদানি বন্ধ থাকায় বর্তমানে দৈনিক প্রায় ১০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হচ্ছে পেট্রোবাংলার।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বদরূল ইমাম বলেন, এখনো আমাদের দেশে প্রচুর গ্যাস মজুদ রয়েছে। বাপেক্সের এই কার্যক্রম চলমান থাকলে সামনে এর সুফল আরো পাওয়া যাবে। নতুন কূপ অনুসন্ধানে পেট্রোবাংলাকে আরো বেশ কিছু পরিকল্পনা নিয়ে বাপেক্সকে কাজে লাগাতে হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য


দেশে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুদ বেড়েছে ৪১ হাজার ৪১৪ কোটি ঘনফুট

আপডেট সময় : ০২:৪১:৩৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩১ ডিসেম্বর ২০২২

ডেস্ক রিপোর্টঃ দেশে চলতি বছরে ছয়টি কূপ পুনঃখনন, অনুসন্ধান ও উন্নয়নের মাধ্যমে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুদ বেড়েছে ৪১ হাজার ৪১৪ কোটি ঘনফুট। চুক্তিভিত্তিক আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) মূল্য প্রতি এমএমবিটিইউ ১৪ ডলার। এই দর ধরে হিসাব করলে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের দাম দাঁড়ায় ৫৫ হাজার ৪১ কোটি টাকা। আর স্পট মার্কেট (খোলাবাজার) থেকে আমদানি করা প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দর ২৪.৭৫ ডলার ধরে হিসাব করা হলে দাম দাঁড়ায় ৯৭ হাজার ৩৭৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকা।

বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) ২০২১ সালের হিসাব অনুযায়ী, দেশে উত্তোলনযোগ্য প্রাকৃতিক গ্যাস মজুদ আছে ১০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ)। দেশে গ্যাসের বার্ষিক চাহিদা প্রায় এক টিসিএফ। যেকোনো কূপ থেকে মজুদ করা গ্যাসের সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ উত্তোলন করা যায়। এই হিসাবে দেশে উত্তোলনযোগ্য গ্যাস ছিল প্রায় আট টিসিএফ। এই উত্তোলনযোগ্য মজুদের সঙ্গে যুক্ত হলো ৪১ হাজার ৪১৪ কোটি ঘনফুট গ্যাস।

পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের মধ্যে দেশের ৪৬টি গ্যাসকূপ পুনঃখনন, অনুসন্ধান ও উন্নয়নের মাধ্যমে দৈনিক ৬১ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা নেয় সরকার। এই পরিকল্পনার আওতায় চলতি বছর বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রডাকশন কম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স) ছয়টি কূপ পুনঃখনন ও অনুসন্ধান কার্যক্রমের মাধ্যমে ৪১ হাজার ৪১৪ কোটি ঘনফুট গ্যাসের মজুদ বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে দৈনিক গ্যাসের উত্তোলন বাড়িয়েছে পাঁচ কোটি ঘনফুট। বর্তমান স্পট মার্কেটে (খোলাবাজার) এলএনজির দর বিবেচনায় এই দৈনিক উত্তোলন করা গ্যাসের দাম ৮২ কোটি টাকার বেশি।

এ ছাড়া খননকাজ চলমান থাকা তিনটি কূপে সম্ভাব্য গ্যাসের মজুদ আছে আরো ৩০৯.৫ বিলিয়ন ঘনফুট। এই তিনটি কূপ থেকে সম্ভাব্য দৈনিক উৎপাদন ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস।

জানতে চাইলে বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘২০২২ সালে ছয়টি কূপ পুনঃখনন ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুদ বাড়ানো হয়েছে ৪১ হাজার ৪১৪ কোটি ঘনফুট। আমরা দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধি করে এলএনজি আমদানির চাহিদা কমিয়েছি। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো না গেলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি করতে হতো। ’

মোহাম্মদ আলী বলেন, বর্তমানে বাপেক্স স্থলভাগে কূপ খননে শতভাগ সক্ষম। গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে বাপেক্স নিজেদের কাজগুলোর পাশাপাশি বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল) ও সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের (এসজিএফএল) গ্যাস ফিল্ডের ওয়ার্কওভার কাজগুলোও করে যাচ্ছে।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে গ্যাসের চাহিদা তিন হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। চাহিদার বিপরীতে এখন পেট্রোবাংলা সরবরাহ করছে দুই হাজার ৬৫০ থেকে দুই হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। তার মধ্যে দেশের ২২টি গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক দুই হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপন্ন হচ্ছে। বাকি ৪৫০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করে পূরণ করা হচ্ছে। আগে পেট্রোবাংলা চাহিদার বিপরীতে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ করতে পারত তিন হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট পর্যন্ত। বিশ্ববাজারে স্পট মার্কেট এলএনজির দাম বাড়ায় সরকার জুলাই মাস থেকে এই এলএনজি আমদানি বন্ধ রেখেছে। এর ফলে গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। স্বল্পমেয়াদি এই পরিকল্পনার আওতায় দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধিতে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি অনেক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, দেশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ছে। ফলে বাড়ছে গ্যাসের চাহিদা। কিন্তু গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় নতুন গ্যাসক্ষেত্র বাড়েনি। গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ব্যবধান বেড়েছে। চাহিদা সামাল দিতে সরকারকে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। দেশীয় গ্যাস উৎপাদনে যে খরচ হয়, এলএনজি আমদানিতে তার চেয়ে সাত থেকে ১০ গুণ বেশি খরচ হয়। এতে জ্বালানি বিভাগের ওপর ভর্তুকি চাপ বেড়েই চলেছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুরনো কূপগুলো ওয়ার্কওভারের মাধ্যমে গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে, এটি নিঃসন্দেহে খুবই ভালো উদ্যোগ। এই উদ্যোগ আরো আট থেকে ১০ বছর আগে নেওয়া হলে জ্বালানির সংকটে পড়তে হতো না। একই সঙ্গে সরকারকে উচ্চমূল্যের এলএনজি আমদানি করার দিকে ঝুঁকতে হতো না। সরকারকে এলএনজি আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর দিকে আরো নজর দিতে বললেন তাঁরা।

জ্বালানি

বাপেক্স সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরে ওয়ার্কওভার, উন্নয়ন ও অনুসন্ধান কার্যক্রমের আওতায় বাপেক্স ৯টি কূপ ওয়ার্কওভার ও অনুসন্ধান করে। এরই মধ্যে ছয়টি কূপের কাজ সফলভাবে শেষ হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সালদা গ্যাসক্ষেত্রের সালদা-২ ওয়ার্কওভার করে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুদ পেয়েছে ৫.২৫ বিসিএফ। এই কূপ থেকে দৈনিক গ্রিডে দেওয়া হচ্ছে তিন মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। সিলেট-৮ কূপে ওয়ার্কওভার করে গ্যাসের মজুদ পেয়েছে ৩২ বিসিএফ। এই কূপ থেকে দৈনিক গ্রিডে দেওয়া হচ্ছে পাঁচ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। সিলেটের কৈলাসটিলা-৭ কূপে ওয়ার্কওভার করে গ্যাসের মজুদ পেয়েছে ৪০ বিসিএফ। দৈনিক ১২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস গ্রিডে দেওয়া হচ্ছে এই কূপ থেকে। বিয়ানীবাজার-১ কূপটি ওয়ার্কওভার করে গ্যাসের মজুদ পেয়েছে ৬১ বিসিএফ। এখান থেকে দৈনিক গ্রিডে দিচ্ছে আট মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। ভোলার শাহবাজপুর ইস্ট-১ অনুসন্ধান কূপে ৩৬.৮৯ বিসিএফ গ্যাসের মজুদ পেয়েছে। এই কূপ থেকে ভোলায় সরবরাহ করা হচ্ছে দৈনিক ২২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্রের টকগী-১ অনুসন্ধান কূপটি উৎপাদনক্ষম করা হয়েছে। খুব শিগগিরই কূপটি উৎপাদনে যাবে। এই কূপে মজুদের পরিমাণ ২৩৯ বিসিএফ এবং দৈনিক ২০ মিলিয়ন ঘনফুট হারে গ্যাস গ্রিডে দেওয়া যাবে।

বাপেক্স সূত্রে আরো জানা গেছে, বাকি তিনটি চলমান কূপের মধ্যে শ্রীকাইল নর্থ-১ অনুসন্ধান কূপে সম্ভাব্য গ্যাস মজুদের পরিমাণ ৪৫.৫ বিসিএফ। এই কূপ থেকে দৈনিক ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট হারে গ্যাস গ্রিডে দেওয়া যাবে। ভোলা নর্থ উন্নয়ন কূপটিতে ১৯১ বিসিএফ সম্ভাব্য মজুদ রয়েছে, কূপটি থেকে দৈনিক ২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস গ্রিডে দেওয়ার সম্ভাবনা আছে। শরীয়তপুর-১ অনুসন্ধান কূপে সম্ভাব্য ৭৩ বিসিএফ গ্যাস মজুদ রয়েছে, দৈনিক ১০ মিলিয়ন ঘনফুট হারে গ্রিডে দেওয়া যাবে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, কূপ ওয়ার্কওভার ও অনুসন্ধানের উদ্যোগটি ধরে রাখতে পারলে খুবই ভালো। এভাবে অব্যাহত থাকলে খুব দ্রুতই আরো ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন বাড়বে। তিনি আরো বলেন, এই উদ্যোগ পেট্রোবাংলার আরো আগেই নেওয়া উচিত ছিল। কূপ ওয়ার্কওভার ও উন্নয়নের পাশাপাশি নতুন নতুন কূপ অনুসন্ধান চালিয়ে গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর দিকেও জোর দিতে হবে।

জ্বালানি বিভাগের হিসাব মতে, ২০২১-২২ অর্থবছরে এলএনজি আমদানি বাবদ ব্যয় হয়েছে ৩৮ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা। মূলত সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি পণ্যটির দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়লেও এ অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে সংস্থাটির। স্পট এলএনজি আমদানি বন্ধ থাকায় বর্তমানে দৈনিক প্রায় ১০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হচ্ছে পেট্রোবাংলার।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বদরূল ইমাম বলেন, এখনো আমাদের দেশে প্রচুর গ্যাস মজুদ রয়েছে। বাপেক্সের এই কার্যক্রম চলমান থাকলে সামনে এর সুফল আরো পাওয়া যাবে। নতুন কূপ অনুসন্ধানে পেট্রোবাংলাকে আরো বেশ কিছু পরিকল্পনা নিয়ে বাপেক্সকে কাজে লাগাতে হবে।