সৈয়দপুর ০৫:৫৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০২৪, ৪ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষায় শিক্ষকরাই সোচ্চার হোক

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৬:০৮:৪০ অপরাহ্ন, বুধবার, ৫ অক্টোবর ২০২২ ৩৪ বার পড়া হয়েছে

ফাতিহুল কাদির সম্রাট

চোখ২৪.নেট অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ফাতিহুল কাদির সম্রাট

উন্মত্ত ইহুদিরা রোমান সম্রাট পন্টিয়াস পাইলেটের কাছে যিশু বা হজরত ঈসা (আ.)-কে ধরে এনেছিল বিচারের জন্যে। তাদের একটাই দাবি, ঈসা (আ.)-কে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে। ঈসা (আ.)-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি প্রচলিত ধর্মমতকে উল্লঙ্ঘন ও অবমাননা করেছেন। সম্রাট পাইলেট ঈসা (আ.)-কে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার মতো কোনো কারণ কিংবা প্রমাণ কোনোটাই পাননি। কিন্তু বাইরে জনরোষ দেখে তিনি ন্যায়ের পক্ষে থাকতে পারলেন না। বিবেকের তাড়নায় সম্রাট জনতার উদ্দেশ্যে সেদিন বলেছিলেন, তোমরা কি এই মানুষটির মৃত্যুর দায় নেবে? বিক্ষুব্ধ জনতা সেদিন চিৎকার করে বলেছিল, তার রক্তের দায় আমরা এবং আমাদের সন্তানরা বংশ পরম্পরায় বহন করব। তবু তার মৃত্যু চাই।

গত জুন মাসে নড়াইলে কলেজ শিক্ষক স্বপন কুমার বিশ্বাসকে মিথ্যা অভিযোগে জনসমক্ষে জুতার মালা পরানোর ঘটনা সচেতন বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল। ৪ বছর আগে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে একজন সংসদ সদস্য শত শত মানুষের সামনে কান ধরে উঠবস করতে বাধ্য করেন। শিক্ষক স্বপন কুমার বিশ্বাস ও শ্যামল কান্তি ভক্ত উভয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ধর্ম-অবমাননা কিংবা ধর্ম অবমাননায় সহযোগিতা করার। পুলিশ ও সরকারি প্রশাসনের উপস্থিতিতে এই দুটি ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটেছিল। ঘটনার পর প্রবল সমালোচনার মুখে দায়িত্বশীলরা বলেন, বিক্ষুব্ধ জনতার চাপের কাছে তারা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছেন। এ দুই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যিশু বা ঈসা (আ.)-কে ক্রুসবিদ্ধ করার ঘটনা। অভিযোগের সত্যতা নয়, জনতার উন্মত্ততার কাছে হেরে গেছে বিচারের বাণী।

শিক্ষকরা নবী নন, সাধারণ মানুষ। তবে নবীদের দায়িত্ব আর শিক্ষকদের দায়িত্বে কিছুটা হলেও সাদৃশ্য বিদ্যমান। তাই তো নবীরা যেমন বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন, মানবজাতির শ্রেষ্ঠ শিক্ষকরাও বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন, শারীরিক-মানসিক নির্যাতন ভোগ করেছেন, মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি পর্যন্ত হয়েছেন। কনফুসিয়াস, সক্রেটিস থেকে শুরু হয়ে আজও চলছে শিক্ষক নিগ্রহের ঘটনা। একবিংশ শতাব্দীতে এসেও বাংলাদেশের শিক্ষক সমাজ সম্মান মর্যাদা পায়নি, পদে পদে হচ্ছেন লাঞ্ছিত। বাংলাদেশের শিক্ষকরা তাদের আদর্শিক জায়গায় স্থিত আছেন কিনা সেটা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে। কিন্তু তারা প্রায় প্রতিদিন যেভাবে নিগ্রহ ও লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছেন তা আমাদের জন্যে কেবল দুঃখজনক নয়, লজ্জাজনকও বটে। মনে হয়, শিক্ষক নিগ্রহের পাপ আমাদের বংশ পরম্পরায় মোচন করতে হবে।

এদেশে শিক্ষক সমাজ নিরীহতম একটি শ্রেণি। এ সমাজে তারা সবচেয়ে অবহেলিত ও উপেক্ষিত পেশার মানুষ। পথের বেওয়ারিশ প্রাণির মতো অবস্থা তাদের। যে কেউ তাদের ওপর হাত তুলতে পারে অবলীলায়। তাদের রক্ষার জন্যে কেউ এগিয়ে আসে না। ফলে প্রতিকারবিহীনভাবে প্রতিদিন শিক্ষক নিগ্রহের ঘটনা ঘটেই চলেছে। ছাত্র, অভিভাবক, ম্যানেজিং কমিটির সদস্য, জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে সরকারি কর্মচারী কেউ কম যান না শিক্ষক নিগ্রহে। শিক্ষকদের কতভাবেই না নিগৃহীত করা হয়। মৌখিক হেনস্থা মামুলি বিষয়। শিক্ষকের গলায় জুতার মালা পরানো, কান ধরে উঠবস করানো, পানিতে চুবানো, এমনকি শিক্ষকের মাথায় মানবমল নিক্ষেপ করার ঘটনাও ঘটেছে। আর মানসিক নিপীড়ন প্রত্যেক শিক্ষকের বলতে গেলে জীবনসঙ্গী।

শিক্ষকরা সবচেয়ে বেশি নিগ্রহের শিকার হন তাদেরই ছাত্রদের দ্বারা। নিজের ছাত্র যখন তাকে উঠিয়ে দিয়ে চেয়ার দখল করে তখন অসহায় শিক্ষকের অন্তর্ভেদী কান্না আর সীমাহীন অপমানের কথা কেউ খেয়াল করে না। সরকার সমর্থিত ছাত্রসংগঠনের সদস্যরা বলা যায় শিক্ষক নিগ্রহের ফ্রি লাইসেন্স নিয়ে ঘোরে। প্রতিষ্ঠানের প্রধানগণ তাদের কারণে স্বাভাবিক কাজকর্ম চালাতে পারেন না, থাকেন মানসিক নিপীড়নের চাপে। রাজনৈতিক ও প্রশাসিনক প্রশ্রয়ের কারণে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেও প্রতিকার মেলে না। অনেক সময় তাদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা পর্যন্ত নেওয়া হয় না।

পরীক্ষার হলে নকল রোধ ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গিয়ে শিক্ষকদের লাঞ্ছিত ও রক্তাক্ত হওয়া এদেশে অতি সাধারণ ঘটনা। ভাইভা পরীক্ষার আপ্যায়নে দাওয়াত না করায় সরকারি শরিয়তপুর সরকারি কলেজের একজন শিক্ষককে প্রহার করে এক ছাত্র নেতা। সম্প্রতি গফরগাঁও সরকারি কলেজে একজন অধ্যাপকসহ দুইজন শিক্ষক ছাত্রনেতা নামধারী সন্ত্রাসীদের দ্বারা প্রহৃত হয়েছেন। এই ঘটনার পেছনের কারণ সত্যিকার অর্থেই অবাক করার মতো। সরকারি নির্দেশে কলেজের সব ধরনের ফি ও মাসুল রকেট-শিউরক্যাশের মতো ডিজিটাল মাধ্যমে আদায়ের ফলে ছাত্রনেতা নামধারীদের বাড়তি ফি আদায়ের মাধ্যমে পকেট ভারি করার পথ বন্ধ হয়ে যায়। ছাত্রনেতা নামধারী দুর্বৃত্তরা কলেজ প্রশাসনের কাছে ১৮ লাখ টাকা পাওনা হয়েছে দাবি করে। সন্ত্রাসীদের বক্তব্য ছিল- কলেজ প্রশাসন ডিজিটাল পদ্ধতিতে অর্থ আদায়ের ফলে তারা এই পরিমাণ অর্থ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তাদের সেই টাকা দিতে হবে। তারা ছাত্রদের কাছ থেকে নগদ অর্থ গ্রহণের নিয়মে ফিরে যেতে চাপ দিলে কলেজ প্রশাসন অপারগতা প্রকাশ করেন। তখন  শিক্ষকদের ওপর হামলা করে সন্ত্রাসীরা। কলেজের মূল্যবান সম্পদ বিনষ্ট করে। এই ঘটনায় থানা মামলা নিতে অপারগতা প্রকাশ করে। এই কলেজেই নকল ধরতে গিয়ে একজন নারী সহকারী অধ্যাপক ছুরিকাঘাতের শিকার হন। ঐ ঘটনাতেও সন্ত্রাসীদের কিছু হয়নি।

শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করার জন্যে অনেক ক্ষেত্রে কোনো কারণ লাগে না। কিছু কারণ রীতিমতো হাস্যকর। দাওয়াত পত্রের খামে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির নামের পূর্বে আলহাজ্ব না লেখায় একজন প্রধান শিক্ষককে লাঞ্ছিত করার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ফরিদপুরের মধুখালিতে পুত্রের প্রেমঘটিত বিষয়ে শিক্ষক পিতাকে থানায় ডেকে এনে ওসি সাহেক কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখেন। কয়েক বছর আগে ভান্ডারিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষা ক্যাডারের একজন সহকারী অধ্যাপককে পরীক্ষার হলে বিরোধের জেরে ম্যাজিস্ট্রেটের পা ধরতে বাধ্য করা হয়। পা ধরার সেই ছবি ছড়িয়ে দেওয়া হয় সোশাল মিডিয়ায়। সেই ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং তা আদালতে ঝুলে আছে। এই মঠবাড়িয়াতেই এজন অধ্যক্ষকে জুতাপেটা করেন কলেজের একজন কর্মচারী। গত ৩ আগস্ট নাটোরে ইউপি চেয়ারম্যান মাদ্রাসার একজন সহকারী অধ্যাপককে তুলে নিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে আটকে রেখে বেদম প্রহার করেন। ঐ চেয়ারম্যান তার সঙ্গীদের সাথে নিয়ে মাদ্রাসায় গিয়ে অধ্যক্ষ ও ম্যানেজিং কমিটিকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করতে থাকেন। ওই শিক্ষক গালাগাল করতে বারণ করেছিলেন। এটাই ছিল সেই শিক্ষকের অপরাধ। ২০১৮ সালে বরিশালে মাদ্রাসার জমি ও ম্যানেজিং কমিটি নিয়ে বিরোধের জেরে মাদ্রাসার অধ্যক্ষের মাথায় কলসভর্তি মানব মল ঢেলে দেওয়া হয়। একজন প্রবীণ আলেমের সাথে এই জঘন্য আচরণটি করা হয় প্রকাশ্য দিবালোকে।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত সর্বস্তরে শিক্ষকরা প্রতিদিন নিগ্রহ ও লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছেন। এর কিছুমাত্র মিডিয়ায় আসে। শিক্ষক নিগ্রহের বিষয় সমাজে তেমন প্রতিক্রিয়া হয় না। এমনকি শিক্ষকরাও প্রতিবাদ করেন না। নড়াইলে জুতার মালা কাণ্ডের পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন মাত্র শিক্ষককে প্রতিবাদ গলায় প্লাকার্ড ঝুলিয়ে প্রতিবাদ করতে দেখা গেছে। শিক্ষকদের এই নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খোদ শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়। বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটির সাথে বৈঠকের সময় তিনি নড়াইলে শিক্ষক স্বপন কুমার বিশ্বাসের নিগৃহীত হওয়ার ঘটনা উল্লেখ করে শিক্ষক সমাজের নীরবতা নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেন।

শিক্ষক নিগ্রহে শিক্ষকদের এই নীরবতা সত্যি ও দুঃখজনক। এর পেছনে মূল কারণ আমাদের শিক্ষার বিভিন্ন ধারা ও স্তরভিত্তিক বিভাজন এবং শিক্ষকদের বিভাজিত মর্যাদা ও অবস্থান। এক ধারা কিংবা স্তরের শিক্ষকগণ আরেক ধারা বা স্তরের শিক্ষকদের বিপরীতে নিজেদের শ্রেয়তর কিংবা নিম্নতর ভাবেন। প্রাইমারি শিক্ষকদের সাথে নিজেদের সম্পর্কিত ভাবেন না হাইস্কুলের শিক্ষকরা। কলেজ শিক্ষকদের সমস্যাকে গুরুত্ব দেন না বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ। প্রাইভেট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা সরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের যেন কেউ নন। মাদ্রাসা ও জেনারেল শিক্ষার দুইটি ধারার মধ্যে আছে আরো উপধারা। এই ধারাগত বিভক্তি শিক্ষদের মাঝে অভিন্ন সত্তার ধারণা ও চেতনা গড়ে উঠতে দেয়নি। ফলে শিক্ষকদের একজনের নিগ্রহে আরেকজনের কিছু আসে যায় না।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো এদেশে শিক্ষকতা স্বতন্ত্র পেশা হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি। ফলে পেশাজীবী শ্রেণি হিসেবে তাদের অভিন্ন পরিচয় এবং সাংগঠনিক সংহতি গড়ে উঠেনি। পেশাগত স্বীকৃতি ও অখণ্ড চেতনার অভাবে শিক্ষকতা বর্তমানে শুধুই চাকরিমাত্র। ঐতিহ্যগতভাবে শিক্ষকতায় যে ব্রতচেতনা ছিল তার ছিটেফোঁটাও আজ আর অবশিষ্ট নেই। স্তর ও ধারা অনুযায়ী অনেক শিক্ষক সংগঠন আছে। এসব সংগঠন মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ নেই, নেই কোনো আন্তঃসাংগঠনিক ফেডারেশন। উপরন্তু সংগঠনগুলোর মধ্যে বিরোধ, বিভক্তি ও রাজনৈতিক দূরত্ব ব্যাপক।

আজ ৫ অক্টোবর বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও শিক্ষক দিবস পালিত হচ্ছে। শিক্ষক দিবসে শিক্ষকতা পেশার সম্মান ও শিক্ষকদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা কামনা করছি। একই সাথে শিক্ষকনিগ্রহে শিক্ষকদের নিষ্ক্রিয় নীরতার অবসান কামনা করছি। আমরা চাই, অভিন্ন পেশাগত পরিচয়ে শিক্ষকদের মাঝে ঐকচেতনা গড়ে উঠুক এবং শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষায় শিক্ষকরাই সোচ্চার হোক।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা, লহ্মীপুর সরকারি কলেজ

প্রচার সচিব, বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতি

(সূত্রঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন)

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য


শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষায় শিক্ষকরাই সোচ্চার হোক

আপডেট সময় : ০৬:০৮:৪০ অপরাহ্ন, বুধবার, ৫ অক্টোবর ২০২২

ফাতিহুল কাদির সম্রাট

উন্মত্ত ইহুদিরা রোমান সম্রাট পন্টিয়াস পাইলেটের কাছে যিশু বা হজরত ঈসা (আ.)-কে ধরে এনেছিল বিচারের জন্যে। তাদের একটাই দাবি, ঈসা (আ.)-কে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে। ঈসা (আ.)-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি প্রচলিত ধর্মমতকে উল্লঙ্ঘন ও অবমাননা করেছেন। সম্রাট পাইলেট ঈসা (আ.)-কে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার মতো কোনো কারণ কিংবা প্রমাণ কোনোটাই পাননি। কিন্তু বাইরে জনরোষ দেখে তিনি ন্যায়ের পক্ষে থাকতে পারলেন না। বিবেকের তাড়নায় সম্রাট জনতার উদ্দেশ্যে সেদিন বলেছিলেন, তোমরা কি এই মানুষটির মৃত্যুর দায় নেবে? বিক্ষুব্ধ জনতা সেদিন চিৎকার করে বলেছিল, তার রক্তের দায় আমরা এবং আমাদের সন্তানরা বংশ পরম্পরায় বহন করব। তবু তার মৃত্যু চাই।

গত জুন মাসে নড়াইলে কলেজ শিক্ষক স্বপন কুমার বিশ্বাসকে মিথ্যা অভিযোগে জনসমক্ষে জুতার মালা পরানোর ঘটনা সচেতন বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল। ৪ বছর আগে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে একজন সংসদ সদস্য শত শত মানুষের সামনে কান ধরে উঠবস করতে বাধ্য করেন। শিক্ষক স্বপন কুমার বিশ্বাস ও শ্যামল কান্তি ভক্ত উভয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ধর্ম-অবমাননা কিংবা ধর্ম অবমাননায় সহযোগিতা করার। পুলিশ ও সরকারি প্রশাসনের উপস্থিতিতে এই দুটি ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটেছিল। ঘটনার পর প্রবল সমালোচনার মুখে দায়িত্বশীলরা বলেন, বিক্ষুব্ধ জনতার চাপের কাছে তারা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছেন। এ দুই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যিশু বা ঈসা (আ.)-কে ক্রুসবিদ্ধ করার ঘটনা। অভিযোগের সত্যতা নয়, জনতার উন্মত্ততার কাছে হেরে গেছে বিচারের বাণী।

শিক্ষকরা নবী নন, সাধারণ মানুষ। তবে নবীদের দায়িত্ব আর শিক্ষকদের দায়িত্বে কিছুটা হলেও সাদৃশ্য বিদ্যমান। তাই তো নবীরা যেমন বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন, মানবজাতির শ্রেষ্ঠ শিক্ষকরাও বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন, শারীরিক-মানসিক নির্যাতন ভোগ করেছেন, মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি পর্যন্ত হয়েছেন। কনফুসিয়াস, সক্রেটিস থেকে শুরু হয়ে আজও চলছে শিক্ষক নিগ্রহের ঘটনা। একবিংশ শতাব্দীতে এসেও বাংলাদেশের শিক্ষক সমাজ সম্মান মর্যাদা পায়নি, পদে পদে হচ্ছেন লাঞ্ছিত। বাংলাদেশের শিক্ষকরা তাদের আদর্শিক জায়গায় স্থিত আছেন কিনা সেটা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে। কিন্তু তারা প্রায় প্রতিদিন যেভাবে নিগ্রহ ও লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছেন তা আমাদের জন্যে কেবল দুঃখজনক নয়, লজ্জাজনকও বটে। মনে হয়, শিক্ষক নিগ্রহের পাপ আমাদের বংশ পরম্পরায় মোচন করতে হবে।

এদেশে শিক্ষক সমাজ নিরীহতম একটি শ্রেণি। এ সমাজে তারা সবচেয়ে অবহেলিত ও উপেক্ষিত পেশার মানুষ। পথের বেওয়ারিশ প্রাণির মতো অবস্থা তাদের। যে কেউ তাদের ওপর হাত তুলতে পারে অবলীলায়। তাদের রক্ষার জন্যে কেউ এগিয়ে আসে না। ফলে প্রতিকারবিহীনভাবে প্রতিদিন শিক্ষক নিগ্রহের ঘটনা ঘটেই চলেছে। ছাত্র, অভিভাবক, ম্যানেজিং কমিটির সদস্য, জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে সরকারি কর্মচারী কেউ কম যান না শিক্ষক নিগ্রহে। শিক্ষকদের কতভাবেই না নিগৃহীত করা হয়। মৌখিক হেনস্থা মামুলি বিষয়। শিক্ষকের গলায় জুতার মালা পরানো, কান ধরে উঠবস করানো, পানিতে চুবানো, এমনকি শিক্ষকের মাথায় মানবমল নিক্ষেপ করার ঘটনাও ঘটেছে। আর মানসিক নিপীড়ন প্রত্যেক শিক্ষকের বলতে গেলে জীবনসঙ্গী।

শিক্ষকরা সবচেয়ে বেশি নিগ্রহের শিকার হন তাদেরই ছাত্রদের দ্বারা। নিজের ছাত্র যখন তাকে উঠিয়ে দিয়ে চেয়ার দখল করে তখন অসহায় শিক্ষকের অন্তর্ভেদী কান্না আর সীমাহীন অপমানের কথা কেউ খেয়াল করে না। সরকার সমর্থিত ছাত্রসংগঠনের সদস্যরা বলা যায় শিক্ষক নিগ্রহের ফ্রি লাইসেন্স নিয়ে ঘোরে। প্রতিষ্ঠানের প্রধানগণ তাদের কারণে স্বাভাবিক কাজকর্ম চালাতে পারেন না, থাকেন মানসিক নিপীড়নের চাপে। রাজনৈতিক ও প্রশাসিনক প্রশ্রয়ের কারণে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেও প্রতিকার মেলে না। অনেক সময় তাদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা পর্যন্ত নেওয়া হয় না।

পরীক্ষার হলে নকল রোধ ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গিয়ে শিক্ষকদের লাঞ্ছিত ও রক্তাক্ত হওয়া এদেশে অতি সাধারণ ঘটনা। ভাইভা পরীক্ষার আপ্যায়নে দাওয়াত না করায় সরকারি শরিয়তপুর সরকারি কলেজের একজন শিক্ষককে প্রহার করে এক ছাত্র নেতা। সম্প্রতি গফরগাঁও সরকারি কলেজে একজন অধ্যাপকসহ দুইজন শিক্ষক ছাত্রনেতা নামধারী সন্ত্রাসীদের দ্বারা প্রহৃত হয়েছেন। এই ঘটনার পেছনের কারণ সত্যিকার অর্থেই অবাক করার মতো। সরকারি নির্দেশে কলেজের সব ধরনের ফি ও মাসুল রকেট-শিউরক্যাশের মতো ডিজিটাল মাধ্যমে আদায়ের ফলে ছাত্রনেতা নামধারীদের বাড়তি ফি আদায়ের মাধ্যমে পকেট ভারি করার পথ বন্ধ হয়ে যায়। ছাত্রনেতা নামধারী দুর্বৃত্তরা কলেজ প্রশাসনের কাছে ১৮ লাখ টাকা পাওনা হয়েছে দাবি করে। সন্ত্রাসীদের বক্তব্য ছিল- কলেজ প্রশাসন ডিজিটাল পদ্ধতিতে অর্থ আদায়ের ফলে তারা এই পরিমাণ অর্থ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তাদের সেই টাকা দিতে হবে। তারা ছাত্রদের কাছ থেকে নগদ অর্থ গ্রহণের নিয়মে ফিরে যেতে চাপ দিলে কলেজ প্রশাসন অপারগতা প্রকাশ করেন। তখন  শিক্ষকদের ওপর হামলা করে সন্ত্রাসীরা। কলেজের মূল্যবান সম্পদ বিনষ্ট করে। এই ঘটনায় থানা মামলা নিতে অপারগতা প্রকাশ করে। এই কলেজেই নকল ধরতে গিয়ে একজন নারী সহকারী অধ্যাপক ছুরিকাঘাতের শিকার হন। ঐ ঘটনাতেও সন্ত্রাসীদের কিছু হয়নি।

শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করার জন্যে অনেক ক্ষেত্রে কোনো কারণ লাগে না। কিছু কারণ রীতিমতো হাস্যকর। দাওয়াত পত্রের খামে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির নামের পূর্বে আলহাজ্ব না লেখায় একজন প্রধান শিক্ষককে লাঞ্ছিত করার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ফরিদপুরের মধুখালিতে পুত্রের প্রেমঘটিত বিষয়ে শিক্ষক পিতাকে থানায় ডেকে এনে ওসি সাহেক কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখেন। কয়েক বছর আগে ভান্ডারিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষা ক্যাডারের একজন সহকারী অধ্যাপককে পরীক্ষার হলে বিরোধের জেরে ম্যাজিস্ট্রেটের পা ধরতে বাধ্য করা হয়। পা ধরার সেই ছবি ছড়িয়ে দেওয়া হয় সোশাল মিডিয়ায়। সেই ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং তা আদালতে ঝুলে আছে। এই মঠবাড়িয়াতেই এজন অধ্যক্ষকে জুতাপেটা করেন কলেজের একজন কর্মচারী। গত ৩ আগস্ট নাটোরে ইউপি চেয়ারম্যান মাদ্রাসার একজন সহকারী অধ্যাপককে তুলে নিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে আটকে রেখে বেদম প্রহার করেন। ঐ চেয়ারম্যান তার সঙ্গীদের সাথে নিয়ে মাদ্রাসায় গিয়ে অধ্যক্ষ ও ম্যানেজিং কমিটিকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করতে থাকেন। ওই শিক্ষক গালাগাল করতে বারণ করেছিলেন। এটাই ছিল সেই শিক্ষকের অপরাধ। ২০১৮ সালে বরিশালে মাদ্রাসার জমি ও ম্যানেজিং কমিটি নিয়ে বিরোধের জেরে মাদ্রাসার অধ্যক্ষের মাথায় কলসভর্তি মানব মল ঢেলে দেওয়া হয়। একজন প্রবীণ আলেমের সাথে এই জঘন্য আচরণটি করা হয় প্রকাশ্য দিবালোকে।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত সর্বস্তরে শিক্ষকরা প্রতিদিন নিগ্রহ ও লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছেন। এর কিছুমাত্র মিডিয়ায় আসে। শিক্ষক নিগ্রহের বিষয় সমাজে তেমন প্রতিক্রিয়া হয় না। এমনকি শিক্ষকরাও প্রতিবাদ করেন না। নড়াইলে জুতার মালা কাণ্ডের পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন মাত্র শিক্ষককে প্রতিবাদ গলায় প্লাকার্ড ঝুলিয়ে প্রতিবাদ করতে দেখা গেছে। শিক্ষকদের এই নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খোদ শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়। বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটির সাথে বৈঠকের সময় তিনি নড়াইলে শিক্ষক স্বপন কুমার বিশ্বাসের নিগৃহীত হওয়ার ঘটনা উল্লেখ করে শিক্ষক সমাজের নীরবতা নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেন।

শিক্ষক নিগ্রহে শিক্ষকদের এই নীরবতা সত্যি ও দুঃখজনক। এর পেছনে মূল কারণ আমাদের শিক্ষার বিভিন্ন ধারা ও স্তরভিত্তিক বিভাজন এবং শিক্ষকদের বিভাজিত মর্যাদা ও অবস্থান। এক ধারা কিংবা স্তরের শিক্ষকগণ আরেক ধারা বা স্তরের শিক্ষকদের বিপরীতে নিজেদের শ্রেয়তর কিংবা নিম্নতর ভাবেন। প্রাইমারি শিক্ষকদের সাথে নিজেদের সম্পর্কিত ভাবেন না হাইস্কুলের শিক্ষকরা। কলেজ শিক্ষকদের সমস্যাকে গুরুত্ব দেন না বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ। প্রাইভেট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা সরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের যেন কেউ নন। মাদ্রাসা ও জেনারেল শিক্ষার দুইটি ধারার মধ্যে আছে আরো উপধারা। এই ধারাগত বিভক্তি শিক্ষদের মাঝে অভিন্ন সত্তার ধারণা ও চেতনা গড়ে উঠতে দেয়নি। ফলে শিক্ষকদের একজনের নিগ্রহে আরেকজনের কিছু আসে যায় না।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো এদেশে শিক্ষকতা স্বতন্ত্র পেশা হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি। ফলে পেশাজীবী শ্রেণি হিসেবে তাদের অভিন্ন পরিচয় এবং সাংগঠনিক সংহতি গড়ে উঠেনি। পেশাগত স্বীকৃতি ও অখণ্ড চেতনার অভাবে শিক্ষকতা বর্তমানে শুধুই চাকরিমাত্র। ঐতিহ্যগতভাবে শিক্ষকতায় যে ব্রতচেতনা ছিল তার ছিটেফোঁটাও আজ আর অবশিষ্ট নেই। স্তর ও ধারা অনুযায়ী অনেক শিক্ষক সংগঠন আছে। এসব সংগঠন মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ নেই, নেই কোনো আন্তঃসাংগঠনিক ফেডারেশন। উপরন্তু সংগঠনগুলোর মধ্যে বিরোধ, বিভক্তি ও রাজনৈতিক দূরত্ব ব্যাপক।

আজ ৫ অক্টোবর বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও শিক্ষক দিবস পালিত হচ্ছে। শিক্ষক দিবসে শিক্ষকতা পেশার সম্মান ও শিক্ষকদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা কামনা করছি। একই সাথে শিক্ষকনিগ্রহে শিক্ষকদের নিষ্ক্রিয় নীরতার অবসান কামনা করছি। আমরা চাই, অভিন্ন পেশাগত পরিচয়ে শিক্ষকদের মাঝে ঐকচেতনা গড়ে উঠুক এবং শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষায় শিক্ষকরাই সোচ্চার হোক।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা, লহ্মীপুর সরকারি কলেজ

প্রচার সচিব, বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতি

(সূত্রঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন)